Friday, October 16, 2026
spot_img
Homeখেলাধূলাআবেগ, অশ্রুতে আর্জেন্টিনা জাতীয় দল থেকে মেসির বিদায়

আবেগ, অশ্রুতে আর্জেন্টিনা জাতীয় দল থেকে মেসির বিদায়

২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানলেন ফুটবল যাদুকর লিওনেল মেসি। বুয়েনস আয়ার্সে সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের হয়ে শেষ ম্যাচে আবেগঘন বিদায় নিলেন তিনি। ভালোবাসায় সিক্ত আর্জেন্টাইন সমর্থকেরা তাকে শেষবারের মতো মাঠে দেখলেন।

নিখুঁত এক সমাপ্তিতে, ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে বিবেচিত ৩৯ বছর বয়সী মেসি ৮৫ হাজার দর্শকের সামনে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ১২৬তম গোলটি করেন। তার দল আর্জেন্টিনা ৩-০ গোলে বেনিনকে হারায়।

রেকর্ড বাড়িয়ে ২০৮তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে নামা মেসি ম্যাচের প্রথম গোলটি অভিজ্ঞ নিকোলাস ওটামেন্দিকে দিয়ে করান। আরেকটি গোল করেন নিকো পাজ।

তবে ম্যাচের ফলাফল ছিল মূল আয়োজনের তুলনায় গৌণ। কারণ, ‘দ্য লাস্ট ট্যাঙ্গো’ নামে পরিচিত এই আয়োজনে মেসি শেষবারের মতো মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামের দর্শকদের ভালোবাসা ও সম্মান উপভোগ করেন।
ম্যাচ শেষে সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে মেসি বলেন, “২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই জার্সি রক্ষা করতে পারা আমার জন্য বিশাল গর্বের বিষয়।”

তিনি বলেন, “আর এখানে না আসাটা ভীষণ কষ্টদায়ক হবে। আমি শপথ করে বলছি, সারা জীবন খেলতে চাই, কারণ আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে খেলা একজন মানুষের জীবনে ঘটতে পারে এমন সবচেয়ে সুন্দর বিষয়।”

তবে অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে মেসির কোনো আক্ষেপ নেই। তিনি আর্জেন্টিনার কঠিন বিশ্বকাপ অভিযানের কথা উল্লেখ করেন, যে সময় তার প্রয়াত বাবা গুরুতর অসুস্থ ছিলেন, এটিও সিদ্ধান্তের অন্যতম কারণ বলে জানান তিনি।

মেসি বলেন, “যদিও আমি সারাজীবন এখানে থাকতে চাই, তবু আমার মনে হচ্ছে এটাই সঠিক সময়। সর্বশেষ বিশ্বকাপটা অনেক বেশি কঠিন ছিল, আমাকে অনেক কিছু পার করতে হয়েছে।”

এর আগে মেসি চোখের পানি মুছতে মুছতে স্টেডিয়ামের পথে এগিয়ে যান। তাকে ও আর্জেন্টিনা দলের সতীর্থদের বহনকারী বাসের চারপাশে ছিল অসংখ্য শুভাকাঙ্খীর ভিড়।

মেসি তার তিন সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে মাঠে প্রবেশ করেন। ভিআইপি বক্স থেকে স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জো ও মা সেলিয়া কুচ্চিত্তিনি তাকে স্নেহভরা হাত নাড়িয়ে শুভেচ্ছা জানান।

কিক-অফের কিছুক্ষণ আগে মাঠে বিশাল একটি আর্জেন্টিনার জার্সি বিছিয়ে দেওয়া হয়। তাতে মেসির ১০ নম্বরের ওপরে লেখা ছিল ‘Gracias’ (ধন্যবাদ)। দর্শকেরা উচ্ছ্বাসে সেটিকে স্বাগত জানান।

ফকল্যান্ডস যুদ্ধের সাবেক সেনা ফ্যাবিও সান্তানা জাতীয় সংগীত গাওয়ার সময় মেসি আবারও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তার পাশে ছিল একটি ব্যানার, যাতে লেখা ছিল “মালভিনাস আর্জেন্টিনার”। ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারানোর পর আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়েরা একই ব্যানার উঁচিয়ে ধরেছিলেন।

ম্যাচের ১০ মিনিটে মেসির বিখ্যাত ১০ নম্বর জার্সির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে খেলা এক মিনিটের জন্য থামিয়ে তাকে করতালিতে অভিবাদন জানানো হয়। বার্সেলোনা ও প্যারিস সেন্ট-জার্মেইনের সাবেক এই তারকা ৭১ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করে বিদায়ী ম্যাচটিকে আরও স্মরণীয় করে তোলেন।

শেষ বাঁশির পর স্টেডিয়ামের আকাশে ড্রোন শো শুরু হয়। রাতের আকাশে ভেসে ওঠে মেসির ছবি এবং আটবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী তারকার দীর্ঘ ক্যারিয়ারের জন্য কৃতজ্ঞতা জানানো হয়।

নিউ জার্সিতে স্পেনের কাছে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের আড়াই মাস পর মেসির বিদায় হলো। সেই ম্যাচে উত্তপ্ত পরিবেশের ১-০ হারে তেমন প্রভাব রাখতে না পেরে অশ্রুসিক্ত চোখে মাঠ ছাড়েন তিনি। তখন মেসি লিখেছিলেন, “আমি সবকিছু উজাড় করে দিয়েছি; দেওয়ার মতো আর কিছুই আমার অবশিষ্ট নেই। তাছাড়া, অসাধারণ কিছু তরুণ খেলোয়াড় উঠে আসছে, যারা নিজেদের সুযোগ পাওয়ার যোগ্য।”

আজকের ম্যাচের আগে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএ) সদর দপ্তরে এক অনুষ্ঠানে বুয়েনস আয়ার্স বিশ্ববিদ্যালয় মেসিকে সম্মানসূচক ডক্টরেট প্রদান করে।

এর আগে আরও বেশি পড়াশোনা না করার জন্য আক্ষেপের কথা বলেছিলেন মেসি। তবে এই সম্মান পেয়ে তিনি গর্ব প্রকাশ করেন।

রসিকতা করে তিনি বলেন, “আমি বলতে পারব যে আমি একজন সম্মানসূচক ডাক্তার!”

আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সদর দপ্তরের বাইরে সমর্থকেরা মেসির ছবি সংবলিত একটি বিশাল আর্জেন্টাইন পতাকা মেলে ধরেন। সেখানে লেখা ছিল, “আমার জীবনের আনন্দ।”

বার্সেলোনায় মেসির সাবেক সতীর্থ নেইমার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ বিদায়ী চ্যাম্পিয়নকে শ্রদ্ধা জানান।

তিনি বলেন, “শুধু আর্জেন্টিনাই নয়, ফুটবলের জন্য তুমি যা করেছ তার জন্য পুরো বিশ্ব তোমাকে ধন্যবাদ জানায় । আমাকে ফুটবলকে আরও বেশি ভালোবাসতে শেখানোর জন্য ধন্যবাদ।”

মেসির সঙ্গে ইন্টার মায়ামির চুক্তি ২০২৮ সাল পর্যৗল্প রয়েছে। তবে দুই মাস আগে তার বাবা হোর্হে মেসির মৃত্যুর পর তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, প্রত্যাশার চেয়েও আগেই হয়তো চিরতরে বুটজোড়া তুলে রাখতে পারেন।

আন্তর্জাতিক ফুটবলে মেসির বিদায় তার সবচেয়ে বড় সাফল্যের চার বছর পর এলো। ২০২২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে নেতৃত্ব দিয়ে ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে দেশকে তৃতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা এনে দেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে দিয়েগো ম্যারাডোনার উত্তরসূরি হিসেবে তার অবস্থান আরও সুদৃঢ় হয়।

আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির সময়ে দলটি একটি বিশ্বকাপ জিতেছে, দুবার রানার্সআপ হয়েছে- ২০১৪ সালে ব্রাজিলে এবং ২০২৬ সালে উত্তর আমেরিকায়। এ ছাড়া ২০২১ ও ২০২৪ সালে কোপা আমেরিকার শিরোপাও জিতেছে আর্জেন্টিনা।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

Recent Comments