অনলাইন ডেস্কঃ- হামে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা গতকাল বুধবার এক হাজার ছাড়িয়ে গেছে। দেশের ইতিহাসে হামে এত মৃত্যুর ঘটনা আগে ঘটেনি। ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় হামের টিকা দেওয়ার কাজে অবহেলাকে এর পেছনে প্রধান কারণ বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। এ ছাড়া শিশুদের কম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও অপুষ্টিকে মৃত্যুর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন তারা।

জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, বাংলাদেশে গত ২০২৫ সালে হাম দূরীকরণের লক্ষ্য ছিল। আর ২০২৬ সালে হাম নির্মূলের সনদ পাওয়া যেত। কিন্তু এবার একেবারে উল্টো হয়ে গেল পরিস্থিতি। যে হাম ভুলে যাওয়া অসুখে পরিণত হয়েছিল, তা আজ হাজারের বেশি মানুষের প্রাণ কেড়ে নিল। চলতি
বছরের শুরু থেকে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হলেও সে বিষয়ে নজর দেওয়া হয়নি। গত মার্চ থেকে হাম ব্যাপকভাবে বাড়তে শুরু করে। কিন্তু চিকিৎসার ক্ষেত্রেও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এপ্রিল থেকে মে মাসজুড়ে চলে গণটিকাদান। কিন্তু সে সময়ও প্রায় ৪০ লাখ শিশু বাদ পড়ে যায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত হামের উপসর্গে ৩ জনের মৃত্যু হয়। এ নিয়ে হামের মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০০২ জনে। এর মধ্যে উপসর্গে মারা গেছে ৯০২ জন, আর হামে ১০০ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, হামের উপসর্গে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ১১৯ শিশু। আর নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ৬৯। গত ১০ এপ্রিল থেকে গতকাল বুধবার পর্যন্ত দেশে উপসর্গ ও নিশ্চিত মিলিয়ে হাম রোগীর সংখ্যা হয়েছে ১ লাখ ৮৭ হাজার ৪৮৪।
জনস্বাস্থ্যবিদ তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, এবার বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মধ্যে হামে সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ হয়েছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশে এত হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুর রেকর্ড এর আগে নেই। এটি নজিরবিহীন।
পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশ এ বছর হাম সংক্রমণে শীর্ষে উঠে এলেও আগের বছরগুলোয় চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২০২৫ সালে রোগী শনাক্ত হয়েছিল ১৩২ জন, ২০২৪ সালে ২৪৭, ২০২৩ সালে ২৮২, ২০২২ সালে ৩১১ জন।
সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে একসময় বাংলাদেশের সাফল্য বিশ্বজুড়ে ছিল আলোচিত। নিয়মিত টিকাদান, জাতীয় ক্যাম্পেইনের কারণে হামসহ এ ধরনের রোগের বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব এড়ানো যাচ্ছিল। এখন সংকট দেখা দেওয়ার মূল কারণ হিসেবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় টিকাদানের ঘাটতিকে চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ডব্লিউএইচওর তথ্যে দেখা যায়, ২০০৬ সালের জাতীয় হাম টিকাদান কর্মসূচিতে ৯ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী ৩ কোটি ৪২ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছিল। লক্ষ্যমাত্রার পুরোটাই বা ১০০ শতাংশ অর্জিত হয়েছিল। ২০১০ সালে ফলোআপ ক্যাম্পেইনে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী ১ কোটি ৮১ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া। সেবারও কভারেজ ছিল ১০০ শতাংশ। ২০১৪ সালে দেশব্যাপী হাম-রুবেলা কর্মসূচির মাধ্যমে ৯ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সী ৫ কোটি ২৭ লাখ শিশুকে টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক হয়েছিল। সেবার কভারেজ ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। ২০২০-২১ সালের পর বিশেষ ক্যাম্পেইন আর হয়নি। এর মধ্যে নিয়মিত টিকাদানের কভারেজও কমতে থাকে। ২০২৫ সালে এ হার ৫৯ শতাংশে নেমে আসে। দেশের বিভিন্ন স্থানে টিকার স্বল্পতাও দেখা দেয়।
এবার প্রাদুর্ভাবের পর গত এপ্রিলে বর্তমান বিএনপি সরকার ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের হামের টিকাদানে বিশেষ ক্যাম্পেইন শুরু করে, কিন্তু তাতেও ৪৬ লাখ শিশু হামের টিকা থেকে বাদ পড়ে গেছে। কারণ, হামের টিকা দিতে এই বয়সী ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ শিশুর হিসাব করা হয়, কিন্তু গত জুনে একই বয়সী ২ কোটি ২৬ লাখ শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনে আওতায় আনা হয়।


